নেতৃত্ব পরিবর্তনে ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচন কাল

নেতৃত্ব পরিবর্তনে ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচন কাল

রেজাউল করিম ভূঁইয়া:

দীর্ঘ ৬ বছরের বেশি সময় পর ভোট যুদ্ধে নামছে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। রাজধানীর উইলস লিটল ফ্ল্যাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে আগামীকাল শনিবার (৯ আগস্ট ) ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ড্যাব নির্বাচনে এবার শীর্ষ পাঁচটি পদের বিপরীতে দুটি প্যানেলে মোট ১০ প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। একই দলের প্যানেল দুইটি হওয়ার কারণে নির্বাচনকে সামনে রেখে উভয় অংশের মধ্যে টান টান উত্তেজনা দেখা বিরাজ করছে। ড্যাব নির্বাচনের পর স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক পরিবর্তন এবং উন্নয়ন দৃশ্যমান হবে বলে অনেকেই মনে করেন। একই সঙ্গে ভোটার তালিকায় কিছু অনিয়ম থাকলেও নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে ড্যাবের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন চিকিৎসকেরা।
বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক অনিয়ম এবং প্রভাব বিস্তার করেছিল স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)। স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির বড় অংশীদার ছিল স্বাচিপ। তবে সরকার পরিবর্তনের পর স্বাচিপ এখন চুপচাপ। তাই স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম এবং সমস্য দূরকরনে নড়েচড়ে বসেছে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের বড় সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দেড় দশকে ড্যাবের মধ্যেও দুটি ধারা বা পক্ষ আছে। সাবেক মহাসচিব এ জেড এম জাহিদ ড্যাবের দায়িত্ব ছাড়েন ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকেই তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও দলের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। এই সময় ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের অনুসারীরা সংগঠনটির নেতৃত্ব নেন। এবারও ড্যাবের পাঁচটি শীর্ষ পদের জন্য দুই প্যানেল থেকে ১০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে এবারের নির্বাচনে একটি পক্ষ সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি ও নির্বাচন কমিশনে থাকা ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত হয়ে সভাপতি পদে ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ ও মহাসচিব পদে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। তাদের সঙ্গে প্যানেলে আছেন, সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান, কোষাধ্যক্ষ পদে ড্যাবের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিদ ডা. মো. মেহেদী হাসান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে অর্থপেডিক সার্জারি অধ্যাপক ডা. একেএম খালেকুজ্জামান দিপু।

অপর প্যানেলে ড্যাবের সাবেক মহাসচিব ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা.এ জেড এম জাহিদ হোসেনের অনুসারী হিসেবে সভাপতি পদে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হক ও মহাসচিব পদে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজের রেসপিরেটরি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আব্দুস শাকুর খান প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। তাদের সঙ্গে প্যানেলে আছেন, সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে বিএমইউর অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ডা. সাইফ উদ্দিন নিসার আহমেদ তুষান, কোষাধ্যক্ষ পদে ইউরোলজিস্ট ডা. তৌহিদ উল ইসলাম জন ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে বিএমইউর উপ-রেজিস্ট্রার ডা. আবু মো. আহসান ফিরোজ। এই প্যানেলর বাইরেও ড্যাবের আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য সচিব ডা. ওবায়দুল কবিরও সভাপতি প্রার্থী।

সভাপতি প্রার্থী ডা.হারুন আল রশিদ ড্যাবের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে ২০১৯ সাল থেকে সর্বশেষ ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। জিয়াউর রহমানের জাগো দল থেকে ছাত্রদল করেন। তিনি বিএমএ’র সাবেক কোষাধ্যক্ষ, ড্যাবের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, বিপিএমপিএ’র সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। এছাড়াও বর্তমানে তিনি বিএমডিসি’র নির্বাহী কমিটির সদস্য, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টাসহ আরো অনেক সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

এছাড়া এই প্যানেলের মহাসচিব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সদ্য সাবেক কোষাধ্যক্ষ ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল। বর্তমানে তিনি রাজধানীর জাতীয় বক্ষব্যাধি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ইতিপূর্বে ডা. শাকিল ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম-মহাসচিব, বিএমএ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দুই বারের নির্বাচিত সমাজকল্যাণ ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া ডা. শাকিল চেস্ট এন্ড হার্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের বর্তমান সভাপতি এবং বিএমআরসি’র ভাইস চেয়ারম্যান। এছাড়াও সাবেক ছাত্রনেতা ডা. শাকিল সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি (১৯৯০), সাবেক সভাপতি ও সেক্রেটারি ছাত্রদল সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ শাখা এবং সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিগত আওয়ামী সরকারের চরম শোষণ ও নিপীড়নের কারণে পেশাগত সকল প্রকার পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে বেশিরভাগ সময়ে মফস্বলেই কাটিয়েছেন ডা. শাকিল। তারপরও হাল ছাড়েননি তিনি। দীর্ঘদিন ড্যাব এ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দিয়ে আসা ডা. শাকিল নির্বাচনে মহাসচিব পদে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে বলেন, বিগত সরকার দূর্নীতি ও সিন্ডিকেট সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের স্বাস্থ্যখাত পুরোপুরি অকার্যকর এবং জনগণকে সেবা বঞ্চিত করেছিল। যে কারণে আমি নিজেও আজ পদোন্নতি বঞ্চিতদের তালিকায়। তাই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সকল চিকিৎসকদের নিয়ে স্বাস্থ্যখাতকে আমি ঢেলে সাজাবো। বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু বা হাসপাতালে রোগী ভর্তিতে দালাল দৌরাত্ন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টেন্ডারবাজিসহ সকল প্রকার অনিয়ম দূর করার মাধ্যমে চিকিৎসাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবো। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব বেরিয়ে আসা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ। এই নির্বাচন থেকে চিকিৎসকেরা এবং দেশবাসী সৎ ও সময়োপযোগী নেতৃত্ব পাবেন বলে আশাবাদী তিনি।

অপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হক এর আগের ১৪ বছর অর্থাৎ ২০০৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ড্যাবের সভাপতি ছিলেন। বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মান্নান ভূঁইয়ার অনুসারী এই চিকিৎসক ১/১১ এর সময়ে সক্রিয় ছিলেন বলে অভিযোগ চিকিৎসকদের। তাদের দাবি, বিএনপির ক্ষমতা ছাড়ার তিন বছর পর পর্যন্ত সে খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজের (বর্তমানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ) অধ্যক্ষ ছিলেন। বর্তমানে শিশু হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আজিজুল হক। সম্প্রতি, শিশু হাসপাতালে ৬৫জনকে অনিয়ম করে নিয়োগ দিয়ে মন্ত্রণালয়ের আদেশে পরবর্তীতে বাতিল করতে বাধ্য হন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ড্যাব নির্বাচনে ভোটার তালিকায় ৩ হাজার ১৫৫ জনের নাম আছে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্যানেলের চিকিৎসকরাই জানিয়েছেন, ভোটার তালিকায় কিছু ত্রুটি আছে। যার মধ্যে ড্যাবের আজীবন সদস্য এমন কিছু চিকিৎসকের নাম তালিকায় নেই। আবার মারা গেছেন এমন চিকিৎসকদের নাম রয়েছে তালিকায়। এছাড়া ভোটার তালিকায় আওয়ামী লীগ সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদদের (স্বাচিব) ৬ সদস্য ও মৃত ১৪ জন ড্যাব সদস্যের নাম রয়েছে। এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভোটার তালিকায় থাকা মৃত ব্যক্তিরা হলেন ডা. এ কে এম তাজউদ্দিন ভূইয়া, ডা. গোলাম মহিউদ্দিন দিপু, ডা. আব্দুস সাত্তার চৌধুরী, ডা. শফিক উল্লাহ, ডা. তৌহিদ আলম, ডা. এ বি এম মূসা, ডা. সাখাওয়াত আলি লসকর, ডা. মো. সোলায়মান, ডা. বজলুর রহমান, ডা. মোহাম্মদ আলী শাহীন, ডা. জাকির হোসেন খান, অধ্যাপক ডা. এ কে এম মুজিবুর রহমান খান, ডা. গোলাম মোক্তাদির। অন্যদিকে নতুন যে তিন শর মতো চিকিৎসক সদস্য হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন, যাঁরা বিতাড়িত আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এ নিয়ে কারও কারও মধ্যে ক্ষোভ বা অসন্তুষ্টি রয়েছে।
ড্যাবের একাংশ মনে করেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করার কারণেই এমনটি হয়েছে। এছাড়াও সম্মেলন কমিটি ও নির্বাচন কমিশনেরও এ বিষয়ে অদক্ষতা রয়েছে। এ বিষয়ে ড্যাব নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত গঠিত নির্বাচন কমিশনের প্রধান ডা. বিজন কান্তি সরকার বলেন, এখন আর কিছু করার নেই। যা আছে তা মেনে নিয়েই সবাই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তবে নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে বলে জানান তিনি।

ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ চলতি বছরের ২৫ মে মেয়াদ শেষ হয়। সংগঠনকে গতিশীল ও চাঙ্গা করার লক্ষ্যে এর আগেই চলতি বছরের ২৪ মার্চ অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ ও ডা. মো. আব্দুস সালামের নেতৃত্বাধীন ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এরপরেই বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহকে আহ্বায়ক করে ১২ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় সম্মেলন প্রস্তুতি ও কাউন্সিল পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে ছয়জন চিকিৎসক ও নন-চিকিৎসক। ছয় চিকিৎসকদের মধ্যে চারজনই ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের অনুসারী। তাঁরা হলেন- ডা. পারভেজ রেজা কাকন, ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন, ডা. শাহ মোহাম্মদ আমানউল্লাহ ও ডা. এরফান সোহেল। এরপর ডা. বিজন কান্তি সরকারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে ড্যাব নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত একটি কমিশন গঠন করা হয়। তিনি গত ২৫ জুলাই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন।

জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেনকে আহ্বায়ক এবং অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারকে সদস্য সচিব করে ড্যাবের প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। এরপর প্রথম ১০ বছরের মধ্যে চারটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সর্বশেষ ডা. হারুন-ডা. সালামের নেতৃত্বে প্রথম নির্বাচিত কমিটি দিয়ে চলছিল ড্যাব। ২০১৯ সালে তাদের ৫ সদস্যের প্যানেল জয়ী হলে ২৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে।

ড্যাব কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য ২৬৪ জন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলর ১৩১ জন এবং অবশিষ্ট কাউন্সিলর জেলা ও অন্যান্য সাংগঠনিক জেলার জনশক্তি। তাদের প্রত্যক্ষ ভোটে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হয়ে থাকেন। আগামীকাল শনিবার (৯ আগস্ট) দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাজধানীর কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক ভোটার উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

OR

Scroll to Top