বাংলাদেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন ছিল রাইসুল ইসলামের। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু ক্রিকেটকে ঘিরে তার যাত্রা থেমেও যায়নি। বরং খেলোয়াড় হিসেবে যে পথ শুরু হয়েছিল, সেটিই একসময় তাকে নিয়ে যায় উদ্ভাবনের জগতে।
টেপ-টেনিস ক্রিকেট থেকে শুরু করে গ্রামীণফোন পেস বোলার হান্ট, ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট- সব মিলিয়ে ফাস্ট বোলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই এগোচ্ছিলেন তিনি। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নতুন দেশে নতুন জীবন শুরু হলেও ক্রিকেটকে ছাড়েননি।
২০১৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক লিগে নিয়মিত খেলেছেন, অংশ নিয়েছেন ইউএসএ ন্যাশনাল ক্রিকেট ট্রায়ালেও। আমেরিকান প্রিমিয়ার লিগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার রাকিম কর্নওয়ালকে আউট করার ঘটনাও তাকে স্থানীয় ক্রিকেট অঙ্গনে পরিচিতি এনে দেয়। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে যায় জীবনের অগ্রাধিকার।
চাকরি, পরিবার এবং ক্রিকেট- সবকিছু সামলাতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, একজন খেলোয়াড় হিসেবে হয়তো নিজের স্বপ্নের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো আর সম্ভব হবে না। তখনই তিনি নিজেকে একটি ভিন্ন প্রশ্ন করেন- ক্রিকেট তাকে কী দিয়েছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তিনি ক্রিকেটকে কী ফিরিয়ে দিতে পারেন?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই শুরু হয় নতুন অধ্যায়। তরুণ ফাস্ট বোলারদের প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে রাইসুল লক্ষ্য করেন, সঠিক কবজির অবস্থান ও সিম কন্ট্রোল শেখানোর জন্য কার্যকর প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম বাজারে খুবই সীমিত। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাকে নতুন কিছু তৈরির অনুপ্রেরণা দেয়।
নিজের খেলোয়াড়ি অভিজ্ঞতা, কোচিং এবং দীর্ঘ গবেষণার সমন্বয়ে তিনি তৈরি করেন নেক্সটজেন রিস্ট ট্রেইনার ফাস্ট বোলারদের কবজির অবস্থান ও সিম কন্ট্রোল উন্নত করার একটি প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম। অসংখ্য নকশা, পরীক্ষা এবং প্রোটোটাইপের পর তৈরি হওয়া এই পণ্য প্রথমে স্থানীয় বোলারদের হাতে তুলে দেন। তাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই তাকে আরও বড় পরিসরে কাজ করার আত্মবিশ্বাস দেয়।
২০২৫ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যটির সফট লঞ্চের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে নেক্সটজেন ক্রিকেট গিয়ার্স। এরপর জ্যামাইকায় কোচ ও খেলোয়াড়দের সামনে পণ্যটি প্রদর্শন এবং নিউইয়র্কের বাফেলোতে প্রথম পাবলিক লঞ্চের মাধ্যমে এটি আরও পরিচিতি পায়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এই প্রশিক্ষণ সরঞ্জামের অর্ডার আসছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেট এর বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিয়ে রাইসুল তার উদ্ভাবিত রিস্ট ট্রেইনার শত শত খেলোয়াড়, কোচ, অভিভাবক ও ক্রিকেটপ্রেমীর সামনে তুলে ধরেছেন। যে ধারণার শুরু হয়েছিল একটি স্কেচবুকের পাতায়, সেটিই আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সম্প্রদায়ের আগ্রহের বিষয়।
রাইসুল ইসলামের কাছে এখন সাফল্যের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে চাপানোর স্বপ্ন হয়তো পূরণ হয়নি, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন- যদি তার উদ্ভাবিত একটি প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম ভবিষ্যতের কোনো ফাস্ট বোলারকে আরও ভালো খেলোয়াড় হতে সাহায্য করে, সেটিও ক্রিকেটের জন্য এক ধরনের অবদান হয়ে রইবে।






