স্ট্রোক হলো একটি দ্রুতগতির ও ভয়াবহ রোগ, যা মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা রক্তক্ষরণের ফলে স্নায়ুবিক কার্যকারিতা ব্যাহত করে। এটি শুধুমাত্র রোগী নয়, পরিবারের জীবন ও অর্থনীতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোক বিশ্বের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী পঙ্গুত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশেও এর প্রাদুর্ভাব দ্রুত বাড়ছে। জীবনধারা, রক্তচাপ, শর্করা ও হার্টের সমস্যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
> স্ট্রোকের প্রকারভেদ
স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনের হঠাৎ বাধা বা অস্বাভাবিকতা, যা মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট করে এবং রোগীর জীবন ও স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করে। মূলত স্ট্রোককে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়—
১. ইস্কেমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke):
এটি সবচেয়ে সাধারণ স্ট্রোক, প্রায় ৮০% ক্ষেত্রে ঘটে। মস্তিষ্কের কোনো ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধা (থ্রম্বাসিস) বা রক্তনালিতে অন্য স্থান থেকে জমাট রক্ত এসে আটকে গেলে (এম্বোলিজম) এ ধরনের স্ট্রোক হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট অংশে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের কোষ মারা যেতে শুরু করে।
২. হেমোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke):
এটি ঘটে যখন মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালী ফেটে যায় এবং রক্তক্ষরণ হয়। উচ্চ রক্তচাপ, মস্তিষ্কে অ্যানিউরিজম বা রক্তনালির দুর্বলতা এর কারণ হতে পারে। এ ধরনের স্ট্রোক অপেক্ষাকৃত কম দেখা গেলেও এটি বেশি প্রাণঘাতী।
এছাড়াও একটি অস্থায়ী ধরনের স্ট্রোক রয়েছে—
ট্রান্সিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (TIA):
এটি “মিনি স্ট্রোক” নামে পরিচিত। স্বল্প সময়ের জন্য রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, তবে স্থায়ী ক্ষতি করে না। এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের পূর্বাভাস হতে পারে।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও সচেতনতা স্ট্রোক প্রতিরোধে অত্যন্ত জরুরি।
> বিশ্বব্যাপী স্ট্রোকের বোঝা (২০২৫ সালের পরিসংখ্যান)
নতুন স্ট্রোক রোগী (Incidence): বছরে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।
* পুরুষ: ≈৫৩% * নারী: ≈৪৭% * তরুণ (১৫–৪৯ বছর): ≈১৫% * স্ট্রোক নিয়ে বেঁচে থাকা (Prevalence): বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ স্ট্রোক-পরবর্তী অবস্থায় বেঁচে আছেন।
* পুরুষ: ≈৫১% * নারী: ≈৪৯% * তরুণ–যুবা: ≈২২% * মৃত্যু: প্রতি বছর প্রায় ৭২.৫ লাখ মানুষ স্ট্রোকজনিত কারণে মারা যায়। * পুরুষ: ≈৫২% * নারী: ≈৪৮%
> ঝুঁকির ধরন:
* বিপাকীয় (উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা) → ৬৯% * পরিবেশগত (বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা, ঘরের ধোঁয়া) → ৩৭% * আচরণগত (ধূমপান, অ্যালকোহল, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা) → ৩৫%
> বাংলাদেশে স্ট্রোক (২০২৫ সালের চিত্র)
* প্রেভেলেন্স: প্রতি ১ লক্ষে ১১৩৯ জন স্ট্রোক রোগী (≈১.১৩৯%)। * বার্ষিক নতুন রোগী (Incidence): ≈৩ প্রতি ১,০০০ জন (০.৩%)।
> ধরণ:
* ইস্কেমিক স্ট্রোক (IS): ≈৫৩–৬১%
* হেমোরেজিক স্ট্রোক (HS): ≈৩৯–৪৫%
* সেরিব্রাল ভেনাস থ্রম্বোসিস (CVT): তরুণ নারী ও গর্ভবতীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
> স্ট্রোকের কারণ
স্ট্রোক হঠাৎ ঘটলেও এর পিছনে বহুদিনের ঝুঁকি কাজ করে—
* উচ্চ রক্তচাপ: সবচেয়ে বড় ঝুঁকি * ডায়াবেটিস ও স্থূলতা * ধূমপান ও তামাক ব্যবহার
* রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল * অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন বা হৃদরোগ
> বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত চাপ
* জন্মগত হৃদরোগ ও জিনগত সমস্যা (শিশুদের ক্ষেত্রে)
* গর্ভাবস্থা-সম্পর্কিত জটিলতা (প্রি-এক্ল্যামসিয়া, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস)
>> নারী, পুরুষ ও শিশুদের স্ট্রোক
> পুরুষ :-
* ধূমপান, অ্যালকোহল, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা—পুরুষদের প্রধান ঝুঁকি। * তুলনামূলকভাবে কম বয়সেই স্ট্রোক হয়।
> নারী :-
* আজীবন স্ট্রোক-ঝুঁকি সামান্য বেশি।
* গর্ভাবস্থা, হরমোন থেরাপি, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, মাইগ্রেন উইথ অরা—নারীর বিশেষ ঝুঁকি।
* স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতা ও মৃত্যু নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
> শিশু :- * শিশুদের মধ্যে স্ট্রোক বিরল হলেও প্রতি বছর হাজারো শিশু আক্রান্ত হয়।
* প্রধান কারণ: জন্মগত হৃদরোগ, সিক্ল সেল, সংক্রমণ, ভাস্কুলার অস্বাভাবিকতা, আঘাত।
* বাংলাদেশে সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও tertiary হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত কেস ধরা পড়ে।
> স্ট্রোকের লক্ষণ (BE-FAST)
* Balance : হঠাৎ মাথা ঘোরা, ভারসাম্য হারানো
* Eyes: দৃষ্টি কমে যাওয়া (এক বা দুই চোখে)
* Face: মুখ একপাশ ঝুলে পড়া
* Arm: হাত/পা দুর্বল হয়ে যাওয়া
* Speech: কথা জড়িয়ে যাওয়া, অস্পষ্ট উচ্চারণ
* Time: দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া—প্রতি মিনিটে মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হয়
* অতিরিক্ত লক্ষণ: তীব্র মাথাব্যথা, হঠাৎ খিঁচুনি, বমি, জ্ঞান হারানো, শরীরের একপাশ অসাড় হওয়া।
> স্ট্রোকের রোগ নির্ণয়
স্ট্রোক নিশ্চিত করতে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালে পৌঁছার পর সাধারণত:
* ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা: শারীরিক ও স্নায়বিক লক্ষণ মূল্যায়ন
* CT Scan Brain: স্ট্রোক ইস্কেমিক নাকি হেমোরেজিক তা চিহ্নিত করার জন্য সবচেয়ে দ্রুত টেস্ট
* MRI Brain: ছোট বা প্রাথমিক স্ট্রোক সনাক্তে বেশি কার্যকর
* রক্ত পরীক্ষা: শর্করা, কোলেস্টেরল, ক্লটিং টাইম, ইনফেকশন ইত্যাদি
* ECG/Echocardiography: হার্টে ক্লট বা রিদমের সমস্যা (AF) আছে কিনা তা জানার জন্য
* Carotid Doppler: মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীর ব্লক বা সংকোচন পরীক্ষা
>> জটিলতা
> তাৎক্ষণিক: * মস্তিষ্কে ফোলা (সেরিব্রাল এডিমা) * হেমোরেজিক রূপান্তর * স্ট্রোক-অ্যাসোসিয়েটেড নিউমোনিয়া * ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস, সংক্রমণ, ডিলিরিয়াম
> দীর্ঘমেয়াদী: * পোস্ট-স্ট্রোক ডিপ্রেশন (≈২৫%)
* স্মৃতিভ্রংশ/ডিমেনশিয়া * পোস্ট-স্ট্রোক এপিলেপসি * স্পাস্টিসিটি, চলাফেরা ও কথা বলার অসুবিধা * বেডসোর, মূত্র-মল নিয়ন্ত্রণহীনতা
> প্রতিরোধ—আমাদের করণীয়
* উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ (১৩০/৮০ এর নিচে রাখা) * ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ * ধূমপান ও তামাক পরিহার * সুষম খাদ্য ও লবণ কম খাওয়া (≤৫ গ্রাম/দিন) * শারীরিক ব্যায়াম (সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট) * এয়ার পলিউশন কমানো, পরিচ্ছন্ন রান্নার চুলা ব্যবহার * অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন রোগীদের অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট ব্যবহার * নারী–শিশুর বিশেষ যত্ন: গর্ভাবস্থা-পরবর্তী যত্ন, শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ স্ক্রিনিং
> হোমিওপ্যাথিক সমাধান:
হোমিওপ্যাথিতে রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা হয়। স্ট্রোক-পরবর্তী দুর্বলতা, বাকরুদ্ধ হওয়া, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা ও মানসিক অবসাদে অভিজ্ঞ চিকিৎসক লক্ষণের ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঔষধ হলো—অ্যার্নিকা, অপিয়াম, বেলাডোনা, নাক্স ভমিকা, জেলসেমিয়াম, ল্যাকেসিস, ফসফরাস, ক্যালকেরিয়া কার্ব এবং বারাইট কার্ব। তবে এই ঔষধগুলো নিজে নিজে ব্যবহার না করে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।তাই স্ট্রোক হলে প্রথমে হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা নেওয়াই মূল। এরপর পুনর্বাসন ও জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি কার্যকর সহায়ক হতে পারে। তাই পরিবার ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনমতো হোমিওপ্যাথিক পুনর্বাসন—এই তিনটি মিলেই স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো এবং রোগীর মানসিক ও শারীরিক শক্তি ফেরানো সম্ভব।
পরিশেষে বলতে চাই, স্ট্রোক আজকের বিশ্বে এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতিবছর বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং অনেকেই মৃত্যুবরণ বা স্থায়ী পঙ্গুত্বে ভোগেন। বাংলাদেশেও এর প্রকোপ ক্রমশ বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রোকের প্রায় ৮০% প্রতিরোধযোগ্য যদি আমরা সচেতন হই এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করি। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ—এসব অভ্যাসই স্ট্রোক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—স্ট্রোক হলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া। কারণ প্রথম কয়েক ঘণ্টাই ‘গোল্ডেন টাইম’, যা জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তাই পরিবার ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, সচেতনতা ও প্রতিরোধই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি