খান মুহাম্মদ রুমেল
টেস্টের প্রথম দিন শেষে আটকে ছিলেন অপরাজিত ৯৯ এ! রাতটা কি নির্ঘুম কেটেছিল মুশির? সেটা জানা না থাকলেও এটি নিশ্চিত করেই বলা যায় কোটি ক্রিকেট ভক্ত কাটিয়েছেন আশাজাগানিয়া এক টেনশনের রাত। সকাল সাড়ে নয়টায় দিনের খেলা শুরু হতেই স্টেডিয়ামে দর্শকের উপস্থিতি জানান দেয় সেই কথাই। অবশেষে দিনের দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরি।
মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশের মুশফিক। শততম টেস্ট খেলছেন – এটিই ছিল বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরম গৌরবের বিষয়। কারণ বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসেই শততম টেস্ট খেলতে পারার তালিকাটা খুব লম্বা নয়। আর সেই শততম টেস্টকে রূপকথার রঙে রাঙালেন বগুড়ারে ছেলে মুশফিকুর রহিম। মুশির কীর্তি দেখে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। শরীরে চিমটি কেটে বুঝতে ইচ্ছে করে এ কি কল্পনা নাকি বাস্তব? অবশ্যই বাস্তব। শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করে ১৮ কোটি বাংলাদেশি আনন্দে ভাসিয়েছেন মুশি। নিত্যদিনের যাপিত জীবনে পোড়খাওয়া দেশের মানুষকে এনে দিয়েছেন স্বস্তির শীতল বাতাস। আনন্দ অশ্রুতে ভাসিয়েছেন অগনিত ক্রিকেট ভক্তকে। শুধু পাঁড় ক্রিকেট ভক্ত নয়, ক্রিকেট থেকে দূরে থাকা ব্যক্তিটিও আজ উদ্বেলিত মুশির মহাকব্যিক কাণ্ডে।
মিরপুরে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড দ্বিতীয় টেস্টের উপলক্ষ তো সবারই জানা ছিল। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে শততম টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন মুশফিকুর রহিম। ম্যাচ শুরুর আগে তাঁর শততম টেস্ট উপলক্ষে বাংলাদেশ এক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করেছিল। সতীর্থদের পাশাপাশি হাবিবুল বাশার সুমন, খালেদ মাসুদ পাইলট, বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলরা করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন মুশিকে।
২০০৫ সালে লর্ডসে অভিষেক হওয়া বেবি ফেসের মুশফিক দেখতে দেখতে ২০ বছর খেলে ফেলেছেন টেস্টে। দীর্ঘ দুই দশক ধরে খেলা বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান এখন ইমরান খান, শচীন টেন্ডুলকারদের মতো কিংবদন্তিদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন। ২০ বছর ১৭৭ দিন টেস্ট খেলে দীর্ঘ সময় টেস্ট খেলা ক্রিকেটারদের তালিকায় তৃতীয় মুশফিক। এই তালিকায় দুইয়ে থাকা ইমরান খান টেস্ট খেলেছেন ২০ বছর ২১৮ দিন। অনুমিতভাবেই এই তালিকায় সবার ওপরে টেন্ডুলকার। ভারতীয় এই ব্যাটিং কিংবদন্তি ক্রিকেটের রাজকীয় সংস্করণে ২৪ বছর ১ দিন খেলেছেন।
সবচেয়ে বেশি সময় টেস্ট খেলা তো বটেই, টেস্ট ইতিহাসে একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ২০০ টেস্ট খেলার কীর্তিও শচীনের। ভারত-ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো বছরে ভূরি ভূরি টেস্ট খেলার সুযোগ পায় না বলে বাংলাদেশের কারও ২০০ টেস্ট খেলার হিসাব না হয় বাদই থাকল। কিন্তু বয়সের ক্ষেত্রে মুশফিক কি পারবেন শচীনকে টেক্কা দিতে? সে ক্ষেত্রে মুশফিককে কমপক্ষে সাড়ে ৩ বছর খেলতে হবে। বর্তমানে তাঁর বয়স ৩৮ পেরিয়ে গেছে। ওয়ানডে ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি আগেভাগেই ছেড়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলেন শুধু টেস্টই। ক্রিকেটের রাজকীয় সংস্করণে খেলা কত দিন চালিয়ে যেতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।
শততম টেস্ট খেলতে নামা মুশফিককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, তামিম ইকবাল, তাইজুল ইসলাম, লিটন দাস, তাওহীদ হৃদয়রা। সকালে অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সতীর্থ সাকিব আল হাসান। নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে সাকিব লিখেছেন, ‘আমার এখনো মনে আছে তোমার অভিষেক হয়েছে লর্ডসে। বিকেএসপির রিক্রিয়েশন রুম থেকে তোমার প্রত্যেকটা বল দেখেছি। সেদিন থেকেই তুমি আমাকে ও বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটারকে অনুপ্রাণিত করছ। তুমি দীর্ঘদিন ধরে খেলছ ও নিজের সেরাটা দিচ্ছ। বয়সভিত্তিক দল থেকে তুমি নেতৃত্ব দিচ্ছ। তোমাকে আমার অধিনায়ক হিসেবে পেয়েছি। সব সময় তুমি আমার অধিনায়ক হয়ে থাকবে। শততম টেস্ট তোমার ক্যারিয়ারের দারুণ এক মুহূর্ত। তোমাকে অসংখ্য শুভকামনা।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটার হিসেবে সবচেয়ে বেশি টেস্ট ম্যাচ, টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ রানের পাশাপাশি টেস্টে সবচেয়ে বেশি দিন খেলার কীর্তিও মুশফিকের। বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে সময়ের হিসাবে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার তালিকায় দ্বিতীয় সাকিব। ১৭ বছর ১৩৬ দিন টেস্ট খেলেছেন সাকিব। সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবরে কানপুরে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের তারকা অলরাউন্ডারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত এটাই সর্বশেষ ম্যাচ।




