হচ্ছে না বিপিএল, ক্রিকেটের জন্য লাভ নাকি ক্ষতি? – Sarabangla

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ঘরোয়া আয়োজন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) এবার মাঠে গড়াচ্ছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল নিজেই বলেছেন এমন কথা। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিপিএল নিয়ে নানা বিতর্ক, আর্থিক লোকসান, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে জটিলতা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ম্যাচ ফিক্সিং ও দুর্নীতির অভিযোগের মতো বিষয় সামনে আসার পর এক মৌসুম বিরতি নিয়ে প্রতিযোগিতাটিকে নতুনভাবে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমন কথা বলা হয়েছে বিসিবির পক্ষ থেকে। বোর্ডের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, এটি বিপিএল বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং আরও কার্যকর ও টেকসই কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিপিএল না হওয়াটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ হবে, নাকি বড় ক্ষতি? এর সরল উত্তর নেই। কারণ একদিকে নিয়মিত আয়োজনের পরও যদি একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট বোর্ডের জন্য লোকসানের কারণ হয় এবং বারবার বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে বিরতি নিয়ে কাঠামোগত সংস্কার করা যৌক্তিক। অন্যদিকে বিপিএল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য সবচেয়ে বড় ক্রিকেটীয় মঞ্চ। এই মঞ্চ না থাকলে ক্রিকেটারদের ম্যাচ খেলার সুযোগ, অর্থনৈতিক আয়, বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করার অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় দলের বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের নিজেদের প্রমাণের সুযোগ—সবই কমে যাবে।

বিসিবির সিদ্ধান্তের পেছনে আর্থিক বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গত দুই মৌসুমে বিপিএল আয়োজন করে প্রায় ৪০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ থেকে যেখানে বোর্ডের রাজস্ব তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে ধারাবাহিক লোকসান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক কাঠামোতে কোথায় সমস্যা রয়েছে!

বিপিএলের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো ধারাবাহিকতা ও পরিকল্পনার অভাব। প্রতি বছরই দল, মালিকানা, সূচি, ভেন্যু, পারিশ্রমিক, খেলোয়াড়দের চুক্তি কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজির নানা বিষয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কোনো কোনো দল সময়মতো অর্থ পরিশোধ করতে পারেনি, আবার ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে বোর্ডের সম্পর্কও সবসময় স্বস্তিদায়ক ছিল না। ফলে মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে মাঠের বাইরের খবর অনেক সময় বেশি আলোচনায় এসেছে। নতুন করে বিপিএল আয়োজনের আগে এসব সমস্যার সমাধান করা তাই জরুরি হয়ে পড়েছে। বিসিবি জানিয়েছে, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর বকেয়া, ব্যাংক গ্যারান্টি এবং অন্যান্য জটিলতা ধাপে ধাপে সমাধানের চেষ্টা চলছে। সেই কারণেই এক বছরের বিরতি।

তবে বিপিএল না হওয়ার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ক্রিকেটারদের ওপর। বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটারের জন্য বিপিএল শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, আয়ের অন্যতম বড় উৎস। জাতীয় দলের বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের জন্য এটি নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর বড় প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে বিপিএল থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা তাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। এক মৌসুম বিপিএল না থাকায় সেই সুযোগটি অন্তত সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এর প্রভাব জাতীয় দলেও পড়তে পারে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিয়মিত ম্যাচ খেলা এবং চাপের পরিস্থিতিতে পারফর্ম করার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপিএলে স্থানীয় ক্রিকেটাররা বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই দলে খেলেন, আন্তর্জাতিক মানের কোচিং পান এবং বিভিন্ন ধরনের ক্রিকেট সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। ফলে জাতীয় দলের জন্য সম্ভাব্য খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রেও বিপিএলের একটি ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষ করে ব্যাটিং ও বোলিংয়ে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে বিপিএল গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দলের নির্বাচকদের নজরে আসার আগে অনেক ক্রিকেটার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কোনো তরুণ পেসার যদি বিপিএলে ধারাবাহিকভাবে দ্রুতগতিতে বল করেন কিংবা কোনো ব্যাটার যদি কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেন, তার আন্তর্জাতিক দলে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। এই জায়গায় এক মৌসুমের শূন্যতা ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতিভা বাছাই প্রক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করতে পারে।

তবে বিপিএল না হওয়ায় সেই সময়ে একটি নতুন টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথা বলা হচ্ছে বিসিবির পক্ষ থেকে। ‘বাংলাদেশ ফাস্ট’ নামের সেই টুর্নামেন্টটি ক্রিকেটারদের আর্থিক লোকসান কমাবে এমনটি বলা হচ্ছে।

এদিকে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো মানসম্মত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট। টি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা যতই বাড়ুক, টেস্ট ক্রিকেটের জন্য খেলোয়াড় তৈরি করতে হলে দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে বিনিয়োগ করতেই হবে। বিপিএলের এক মৌসুমের বিরতিকে যদি বিসিবি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের অবকাঠামো উন্নয়ন, ম্যাচ ফি বৃদ্ধি, ভালো উইকেট তৈরি এবং খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত ম্যাচ নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করে, তাহলে এই বিরতি ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ফল দিতে পারে।

ক্রিকেটারদের আর্থিক দিকটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিপিএল না হলে অনেক খেলোয়াড় বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হবেন। ফলে বিসিবির কাছে ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচ ফি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দেওয়া দাবি উঠছিল। বিসিবি অবশ্য ইতোমধ্যেই সেই দাবি মিটিয়েছে। সম্প্রতি মোটা অঙ্কের ম্যাচ ফি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি।

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড মূল্যও একটি আলোচনার বিষয়। বিশ্বের প্রায় সব বড় ক্রিকেট খেলুড়ে দেশই কোনো না কোনো শক্তিশালী ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগ আয়োজন করে। ভারতের আইপিএল, অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ, পাকিস্তানের পিএসএল, ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ২০ নিজেদের ক্রিকেটের বাণিজ্যিক শক্তি বাড়িয়েছে। বিপিএল সেই জায়গায় এখনও ধারাবাহিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। এক মৌসুম বিরতি নিয়ে যদি বিসিবি সত্যিই টুর্নামেন্টের ব্র্যান্ডিং, সম্প্রচার, স্পনসরশিপ ও ফ্র্যাঞ্চাইজি কাঠামো নতুন করে সাজাতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বিপিএল আরও শক্তিশালীভাবে ফিরতে পারে যেটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ব্র্যান্ড ভ্যালুও বাড়বে।

বিপিএলে সম্প্রতি দুর্নীতি ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, এমন খবর একটি টুর্নামেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত করে। তাই ভবিষ্যতের বিপিএলে অ্যান্টি-করাপশন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করা এবং খেলোয়াড় ও ফ্র্যাঞ্চাইজির আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিপিএল পেছানোর কারণ হিসেবে এসবও উঠে এসেছে।

এখানে বিসিবির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—বিরতিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়। শুধু এক বছর বিপিএল আয়োজন না করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এই সময়ের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, মালিকানা কাঠামো, ব্যাংক গ্যারান্টি, খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিশ্চিতকরণ, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং ডিজিটাল কনটেন্ট—সবকিছুকে একটি স্বচ্ছ কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিপিএলকে শুধু ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি একই সঙ্গে বিনোদন, একটি ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম এবং ক্রিকেটার তৈরির একটি ব্যবস্থা। এই তিনটি জায়গায় ভারসাম্য তৈরি করতে পারলেই বিপিএল বাংলাদেশের ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য তৈরি করতে পারবে।

তাই এবারের বিপিএল না হওয়াকে এক কথায় লাভ বা ক্ষতি বলা কঠিন। স্বল্পমেয়াদে এটি ক্রিকেটার, কোচ, ফ্র্যাঞ্চাইজি, সম্প্রচারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার জন্য ক্ষতির কারণ হবে। দর্শকরাও দেশের সবচেয়ে বড় ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি আসর থেকে বঞ্চিত হবেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই বিরতি যদি বিপিএলের কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এটিই বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি প্রয়োজনীয় ‘রিসেট’ হয়ে উঠতে পারে।

আসল প্রশ্ন হলো, বিপিএল যখন আবার ফিরবে, তখন সেটি কি আগের সেই অনিয়ম, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সমস্যাগুলো নিয়েই ফিরবে, নাকি একটি পেশাদার, লাভজনক ও বিশ্বাসযোগ্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হিসেবে ফিরবে? বিসিবির সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সেটিই।

কারণ একটি মৌসুম না খেলা হয়তো সাময়িক ক্ষতি। কিন্তু ভুল কাঠামোয় বছরের পর বছর বিপিএল চালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আরও বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। আর যদি এই বিরতিকে কাজে লাগিয়ে টুর্নামেন্টকে নতুনভাবে সাজানো যায়, তাহলে এবারের ‘না হওয়া’ই হয়তো ভবিষ্যতের শক্তিশালী বিপিএলের ভিত্তি তৈরি করবে।

OR

Scroll to Top